অদৃশ্য_শাস্তি ২
লেখক Abdul_hoq
ডাক্তারের কথাটা শেষ হতে না হতেই হাসপাতালের ঘরটা যেন এক অদ্ভুত নীরবতায় ঢেকে গেল।
ফ্যানের শব্দটাও কেমন দূরের মতো শোনাতে লাগল।
আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, কিন্তু আমার ভেতরের পৃথিবীটা ভেঙে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
অরিন্দম… আমার স্বামী…
তার হাত এখনো কাঁপছে। চোখ নামিয়ে রেখেছে। যেন সে জানত এই দিনটা একদিন আসবেই।
ডাক্তার আবার ধীরে ধীরে বললেন—
“এই ফাইলটা অনেক পুরোনো। আঠারো বছর আগের রিপোর্ট অনুযায়ী… উনি যে অবস্থায় ছিলেন… সেটা সাধারণ কোনো রোগ না।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, গলা শুকিয়ে গেছে—
“মানে?”
ডাক্তার একটু থামলেন। তারপর ফাইলটা খুলে দেখালেন।
“ওনার স্নায়বিক একটা জটিল সমস্যা ছিল। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা… উনি জানতেন, ভবিষ্যতে ধীরে ধীরে নিজের স্মৃতি, অনুভূতি এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।”
আমি যেন কিছু বুঝতে পারলাম না।
“তার মানে…?”
ডাক্তার এবার সরাসরি আমার দিকে তাকালেন।
“মানে, আঠারো বছর আগে উনি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—নিজেকে ইমোশনালি আলাদা করে ফেলবেন। কারও কাছে না ভাঙার মতো করে বাঁচবেন।”
আমি হেসে ফেললাম, কিন্তু সেটা হাসি না—ভাঙা শব্দ।
“শাস্তি? আমাকে? নাকি নিজেকে?”
ডাক্তার উত্তর দিলেন না।
শুধু ফাইলের একটা পৃষ্ঠা এগিয়ে দিলেন।
সেখানে লেখা ছিল—
“Patient has voluntarily opted for emotional isolation protocol after traumatic marital betrayal.”
আমি কাগজটা ধরে ফেললাম।
“না… এটা সম্ভব না… আমি শুধু একবার ভুল করেছি… শুধু একবার…”
আমার গলা ভেঙে যাচ্ছিল।
অরিন্দম হঠাৎ মাথা তুলল।
তার চোখে এত বছর পর প্রথমবার আমি কিছু দেখলাম—না রাগ, না ঘৃণা… শুধু ক্লান্তি।
সে খুব নিচু গলায় বলল—
“তুমি ভাবো আমি তোমাকে শাস্তি দিয়েছি?”
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
সে ধীরে ধীরে বলল—
“আমি নিজেকে বাঁচাতে পারিনি নীলা।”
ঘরটা আবার চুপ হয়ে গেল।
সে বলল—
“সেদিন রাতে তুমি যখন ফিরে এসেছিলে… আমি ভেঙে পড়েছিলাম। কিন্তু তোমাকে হারানোর চেয়ে বেশি আমি নিজেকে ঘৃণা করতে শুরু করেছিলাম। আমি জানতাম, আমি আর আগের মতো থাকতে পারব না।”
তার হাত ধীরে ধীরে টেবিলে রাখা বালিশটার মতো কাগজটা ছুঁয়ে দেখল।
“তাই আমি দূরত্ব বানিয়েছিলাম। ভাবলাম… যদি আমি তোমাকে ছুঁই না, তাহলে হয়তো আমি নিজেকে আর অপমান করব না।”
আমি কাঁদছি এখন।
নিঃশব্দে। ভেতর থেকে ভেঙে।
“তুমি… আঠারো বছর ধরে আমাকে শাস্তি দিয়েছ…”
সে মাথা নাড়ল।
“না নীলা। আমি তোমাকে ছুঁতে ভয় পেতাম… কারণ আমি ভয় পেতাম, যদি আবারও ভালোবাসি, আবারও ভেঙে পড়ব।”
ডাক্তার ধীরে ধীরে বললেন—
“এটা সাধারণ প্রতিশোধ ছিল না। এটা একটা দীর্ঘ মানসিক আত্ম-নির্বাসন।”
আমি অরিন্দমের দিকে তাকালাম।
“তুমি আমাকে ঘৃণা করোনি?”
সে খুব ধীরে বলল—
“ঘৃণা করলে এত বছর একসাথে থাকা যেত না।”
এই কথাটা যেন আমার বুকের ভেতর গেঁথে গেল।
হঠাৎ সে ফিসফিস করে বলল—
“আর একটা কথা আছে।”
ডাক্তার ফাইলের শেষ পাতাটা খুললেন।
“আঠারো বছর আগে… যে ঘটনার কথা বলা হচ্ছে… সেখানে একটা তথ্য মিসিং ছিল।”
আমি থেমে গেলাম।
ডাক্তার বললেন—
“সেই রাতে শুধু একপক্ষই ভুল করেনি।”
আমি চোখ বড় করে তাকালাম।
অরিন্দম চোখ বন্ধ করল।
ডাক্তার বললেন—
“রিপোর্ট অনুযায়ী, ওই ঘটনার আগে উনি নিজের স্ত্রীর কাছ থেকে এক গুরুত্বপূর্ণ সত্য লুকিয়েছিলেন। যা জানলে হয়তো… এই সম্পর্কটা ভাঙত না।”
আমি নিঃশ্বাস আটকে গেলাম।
“কি সত্য?”
ডাক্তার ফাইলটা বন্ধ করলেন।
“ওই সময়ে উনি আরেকটা সম্পর্ক শেষ করতে পারেননি… এবং সেটার মানসিক প্রভাব আপনাদের সম্পর্কে পড়েছিল।”
ঘরটা এবার পুরোপুরি ভেঙে পড়ল।
আমি অরিন্দমের দিকে তাকালাম।
“এটা কি সত্য?”
সে কিছুক্ষণ চুপ রইল।
তারপর বলল—
“হ্যাঁ।”
এই এক শব্দে আঠারো বছর যেন এক মুহূর্তে ছিঁড়ে গেল।
সব ব্যথা, সব শাস্তি, সব নীরবতা—একসাথে দাঁড়িয়ে পড়ল।
আমি ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লাম।
অরিন্দম আমার পাশে এসে দাঁড়াল।
তার গলা কাঁপছে।
“আমি তোমাকে ছেড়ে দিইনি নীলা…
আমি শুধু নিজের দো*ষের সাথে বাঁচতে পারিনি।”
আমি ফাঁকা চোখে তাকিয়ে আছি।
বাইরে জানালা দিয়ে আলো ঢুকছে।
কিন্তু আমার ভেতরে কোনো আলো নেই।
ডাক্তার ধীরে বললেন—
“এখন প্রশ্ন একটাই… আপনারা কি এই আঠারো বছরের দূরত্বটা শেষ করতে চান, নাকি বুঝতে চান এটা কেন শুরু হয়েছিল?”
ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল।
অরিন্দম আমার দিকে তাকাল।
আমি তার দিকে।
আঠারো বছরের বালিশটা যেন এখনো আমাদের মাঝে পড়ে আছে…
কিন্তু এবার সেটা শাস্তি না…
একটা প্রশ্ন।
আর সেই প্রশ্নের উত্তর—
আমাদের দুজনকেই আবার নতুন করে বাঁচতে বা ভাঙতে বাধ্য করবে।
চলবে...?
0 মন্তব্যসমূহ